প্রোমোটারদের থাবা কি তবে আরও প্রশস্থ হতে চলেছে ? কলকাতার প্রায় ৩৫০০ বস্তি নিয়ে ঘনাচ্ছে সিঁদুরে মেঘ, তুমুল বিতর্ক শুরু মেয়রের নতুন সিদ্ধান্তে

বাংলার খবর | বেস্ট কলকাতা নিউজ

বেস্ট কলকাতা নিউজ : এবার বস্তি বা উত্তরণের জমি নিয়ে কলকাতার মেয়রের সিদ্ধান্তে বিতর্ক। শহরের সব বস্তির জমি ঠিকা প্রজা আইনের অধীনে নিয়ে আসার সিদ্ধান্ত পুরসভার। আর এই সিদ্ধান্তের জেরে বস্তির জমিতে প্রোমোটারদের থাবা আরও আগ্রাসী হবে বলে আশঙ্কা প্রশাসনিক মহলের বড় অংশের। যদিও সরকারের দাবি, ‘ঠিকা প্রজার’ হাত ধরেই আসলে প্রোমোটারদেরই কালো হাত ভাঙা সম্ভব হবে। আইনি ‘অধিকার’ পাবে বস্তিবাসীরা। যদিও বিরোধীরা তা মানতে নারাজ। তাঁদের সাফ কথা, পুরোটাই আইওয়াশ।

সম্প্রতি, কলকাতা পুরসভার ৭২ নম্বর ওয়ার্ডে দু’টি বস্তির বাসিন্দাদের উচ্ছেদ করে সেখানে প্রমোটিং করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। নির্মাণকারী সংস্থা সেই জমি কিনে নেয়। নিজের বিধানসভা এলাকায় এই ঘটনা ঘটনায় ক্ষুব্ধ হন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। এরপরই বস্তি থেকে যাতে কাউকে উচ্ছেদ না করা হয় তার জন্য কলকাতার মেয়রকে গোটা বিষয়টি দেখতে বলেন।

কী বলছেন মেয়র ফিরহাদ হাকীম ? ফিরহাদ হাকীম বলেছেন,, “৭২ ওয়ার্ডে দু’টো বস্তি প্রোমোটারের থাবায় চলে গিয়েছে। গরিব মানুষদের থ্রেট দেওয়া হচ্ছে। ভয়ে হোক বা টাকা নিয়ে তাঁরা এলাকা ছেড়ে দিচ্ছেন। কলকাতার বস্তির মানুষের রাখার দায়িত্ব আমাদের। তাই উত্তরণের যাতে উত্তরণ হয় তাই কলকাতার সব বস্তিতে বাংলার বাড়ি করে দেব।”

‘ঠিকা প্রজা (টেনেন্সি) অ্যাক্ট’ কী? জটিলতা কোথায়? কী বলছে সরকার?

ফিরহাদ বারবার বলছেন ‘ঠিকা টেনেন্সি অ্যাক্ট’ এর কথা। কী ক্ষমতা রয়েছে এই আইনের, কীভাবে তা গরিব মানুষের হাত শক্ত করছে তাও ব্যখ্যা করেন ফিরহাদ। যুক্তি দিয়েই বলছেন, “বস্তি এলাকাগুলি তো আগে খালি ছিল। সেখানে যে যার নিজের বাড়ি হয়েছে। আমরা ওখানে বাড়ি করে দেব। তাঁরা ঠিকা টেনেন্ট হবে। এগুলো সব ঠিকা টেনেন্সি অ্যাক্টের আওতায় চলে আসবে। এতে বস্তির লোক নিজেদের অধিকার পাবে। কেউ তুলে দিতে পারবে না। বস্তির জমি ঠিকা হয়ে যাবে। সেই ঠিকায় যাঁরা থাকবে তাঁরা সরকারের ভাড়াটিয়া। সেখানে আমরা বাংলার বাড়ি করে তাঁদের ভালভাবে রাখতে পারব।”

পুরসভার অনেকেই মনে করেছেন, বস্তি থেকে উচ্ছেদ ঠেকাতে গিয়ে, সে ব্যাপারে সক্রিয় হতে গিয়ে ঠিকার আওতায় আনার সিদ্ধান্তে বিতর্ক আরও বাড়ল। মূলত ৩ ধরনের জটিলতা তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

১) শহরে এমন অনেক বস্তি রয়েছে, যেখানে অনেকেই নিজেদের জমিতে ঘর করে বসবাস করেন। প্রশ্ন উঠছে, তাঁরা কেন নিজের জমি সরকারের হাতে তুলে দেবে। তাতে বেহাত হওয়ার আশঙ্কা থাকতে পারে বলে জানাচ্ছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।

২) আবার এমন কিছু জমি আছে, যেগুলি রেল বা কেন্দ্রীয় সরকারের অধীনস্থ। সেই সব জমি দখল করে বাস করছেন বহু মানুষ। এখানে প্রশ্ন উঠছে কেন্দ্রের জমি আদৌ ঠিকা প্রজা আইনে রাজ্য সরকার নিতে পারে কিনা! এখানেই আইন জটিলতা সবচেয়ে বেশি বলে ওয়াকিবহল মহলের মত।

সেই জমিগুলি ঠিকার আওতায় আনা কোনওভাবেই সম্ভব নয়। এভাবেই আইন বদল করা যায় না বলেই দাবি খোদ কলকাতা পৌরসভার বস্তি বিভাগের মেয়র পারিষদ (বস্তি) সদস্য স্বপন সমাদ্দারের। মেয়র পারিষদের মতে, ব্যক্তিগত জমি বা কেন্দ্রীয় সরকারের সংস্থার জমি রাজ্য সরকারের টিকা কন্ট্রোলারের আওতায় আনা যায় না। সে ক্ষেত্রে একটা উত্তরণের জমিতে দু’রকম সিদ্ধান্ত নিয়ে ঘর তৈরি করা সম্ভব নয়।

৩) যদি আইনি জটিলতা এড়িয়ে বস্তিবাসীদের পুনর্বাসন দিতে ‘আমার বাড়ি’ প্রকল্পে ফ্ল্যাট হয়, সেখানে স্থানীয় নেতা বা প্রমোটারদের বাড়বাড়ন্ত হবে। বিরোধীদের অভিযোগ, প্রমোটাররা ভয় বা প্রলোভন দেখিয়ে ফের উচ্ছেদ করতে পারে বস্তিবাসীদের।

স্বপন সমদ্দার বলছেন, “আমি জানি না ফিরহাদ কীভাবে বলেছেন, উনি মহানাগরিক, উনি মন্ত্রী! তবে কলকাতা শহরে বিভিন্ন চরিত্রের প্রায় সাড়ে তিন হাজারের বেশি বস্তি আছে। সেগুলি বিভিন্ন আঙ্গিকে বিচার করতে হয়। কোনও জায়গা যেমন রয়েছে ঠিক টেনেন্সি অ্যাক্ট অনুযায়ী আবার কোনও কোনও জমি রেল, পোর্ট, সেচের। সেগুলিতে মানুষ দীর্ঘদিন ধরে বসবাস করছ। কোনও কোনও জায়গা আছে সরকারি মালিকানায়।” এদিকে অসাধু প্রোমোটারদের দাপট বৃদ্ধির কথা একেবারে উড়িয়ে দিচ্ছেন না পুরসভার চেয়ারপার্সন মালা রায়। তিনি জানান, “প্রোমোটাররা একটা থাবা বসাচ্ছে। সব সময় যে ভাল প্রোমোটার আসছে তা তো নয়। অসাধু প্রোমোটাররা পৌরসভার নিয়মকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে তাঁদের উচ্ছেদ করে সেখানে প্রোমটিং করে।”

কী বলছে বিরোধীরা? তবে পুরসভার একটা মহলের দাবি, মূলত ঠিকার অধীনে এসে গেলে সেখানে বহুদল নির্মাণ করা অনেকটাই সহজ হয়ে দাঁড়াবে। অনেকেই বলছেন, উত্তরণ বা বস্তির জমিতে বসবাসকারী মানুষদের আবাসন করে দেওয়ার নামে প্রভাবশালী নেতাদের কাছের প্রোমোটাররা সহজে নির্মাণ তৈরির ছাড়পত্র পেয়ে যাবে। বিরোধীদের দাবি, এই সিদ্ধান্তে সিন্ডিকেট ব্যবসা যেমন বাড়বে, তেমনই অর্থনৈতিকভাবে আরও বেশি ফুলেফেঁপে উঠবে নেতা থেকে প্রোমোটাররা। বিরোধীরাও বলছেন, এই সিদ্ধান্তে বাড়বে সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য।

বিজেপি কাউন্সিলর সজল ঘোষ বলছেন, “এমনভাবে এটা তৈরি হচ্ছে যার বেশিরভাগটাই আমাদের ববিদার ভাইদার ভাইরা পাবে। ঠিকার আওতায় চলে যাওয়ার পর সেই ঠিকার উপরে ফ্ল্য়াট তৈরি হবে। সেই ফ্ল্য়াটে বস্তিবাসী লোকগুলোর আর কোনও জায়গা হবে না। প্রোমোটার কীভাবে ওই ঘর আলাদা আলাদা করে করবে? ফলে ভয় দেখিয়ে ওদের তাড়িয়ে দেওয়া হবে, তার উপর ফ্ল্যাট হবে।”

এদিকে তথ্য় বলছে, কলকাতায় রয়েছে প্রায় ৩৫৩৪টি বস্তি বা উত্তরণ। শহরের দক্ষিণ এলাকার তুলনায় উত্তর এবং মধ্য কলকাতায় বস্তির সংখ্যা অনেকটাই বেশি। বিরোধীদের অভিযোগ, বস্তির জমি দীর্ঘদিন ধরেই টার্গেট শাসকদলের নেতাদের একাংশের কাছে। নয়া সিদ্ধান্ত কার্যকর হলে সেই নেতাদের ঘনিষ্ঠ জমি হাঙ্গররা আরও আগ্রাসী মনোভাব নিয়ে ময়দানে নেমে পড়বে বলেই দাবি পুরসভার একাংশের। এখন দেখার শেষ পর্যন্ত জল কোথায় গিয়ে দাঁড়ায়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *