নৌবিদ্রোহের প্রাণকেন্দ্রেই আজও চরম উপেক্ষিত দেশের বীর জওয়ানরা, স্বাধীনতার ৭৯ বছরেও আজ তৈরি হয়নি কোনো সংগ্রহশালা

বাংলার খবর | বেস্ট কলকাতা নিউজ

বেস্ট কলকাতা নিউজ : বেগার্স ক্যান নট বি চুজার্স! অর্থাৎ, ভিক্ষুকের আবার বেছে নেওয়ার অধিকার? উপেক্ষা, অপমান, বিদ্রুপের এই কয়েকটা শব্দই জ্বালিয়েছিল বিদ্রোহের আগুন। ১৯৪৬ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি তৎকালীন বম্বের উপকণ্ঠে থাকা সামরিক জাহাজ ‘তলোয়ার’ উড়িয়েছিল প্রতিবাদের নিশান। হরতাল ঘোষণা করেছিলেন কর্মীরা। পরের দিন তা ক্যাসল ব্যারাকসের রয়্যাল ইন্ডিয়ান নেভিতেও তা ছড়িয়ে পড়ে। নৌ-সেনানীদের দাবির সমর্থনে রাস্তায় নেমে আসে বাণিজ্য নগরী। প্রাণপণ লড়াইয়ের পর শেষ পর্যন্ত আত্মসমর্পণের রাস্তায় হাঁটেন বোম্বে বন্দরের ২৬ জাহাজের নাবিক আর সেনারা। দাঁড়ি পড়ে রক্তক্ষয়ী অধ্যায়ে।

আদতে এটাই পরাধীনতার শৃঙ্খল মোচনের জন্য শেষ সংগ্রাম। নেতাজির আজাদ হিন্দ ফৌজ আগেই প্রশ্ন তুলেছিল ব্রিটিশের অধীনে থাকা ভারতীয় সৈন্যদের আনুগত্যে। নৌবিদ্রোহ হয়ে ওঠে কফিনে শেষ পেরেক। ফলশ্রুতিতে প্রস্তাবিত সময়ের ন’মাস আগেই ক্ষমতা হস্তান্তরের সিদ্ধান্তে সিলমোহর পড়ে। অথচ, স্বাধীনতার ৭৯ বছর পেরিয়ে গেলেও উপেক্ষিত সেই বিদ্রোহ।

বন্দরের যেখানে ডালপালা মেলেছিল নৌ-বিদ্রোহ, সেখানে প্রবেশের অনুমতি মিলল না। কিন্তু তার কোনও স্মারক বা স্মৃতিচিহ্নও তো নেই। জানা গেল, মুম্বই জুড়েই নৌবিদ্রোহের স্মৃতিচিহ্ন অনুপস্থিত। গড়া হয়নি সংগ্রহশালাও। এমনকী, এই বিষয়ের আর্কাইভও নেই। অর্থাৎ, ইতিহাসের উৎসাহী পড়ুয়াদের আলোকপ্রাপ্ত হওয়ার সম্ভাবনা আরব সাগরের বিশ বাঁও জলেই ডুবেছে। শোনা যায় যে, সেই যুদ্ধের অন্যতম নায়ক বর্ধমানের বলাই দত্ত তাঁর কাছে থাকা সব নথিপত্র জ্বালিয়ে দিয়েছিলেন তীব্র হতাশায়। কিন্তু তার বাইরেও থাকার কথা অজস্র সরকারি ফাইল। যেখানে প্রতিফলিত ছিল ব্রিটিশদের মনোভাব। যদিও তার কোনও অস্তিত্ব স্বাধীন ভারতে নেই। কংগ্রেস ও মুসলিম লিগ পাশে দাঁড়ায়নি বলেই কি এই অধ্যায়কে মুছে দেওয়ার চেষ্টা?

অথচ, তাৎপর্যের দিক থেকে নৌবিদ্রোহকে খাটো করে দেখার কোনও জায়গা নেই। ১৮৫৭ সালের সিপাহি বিদ্রোহের মতো এক্ষেত্রেও ইন্ধন দিয়েছিল চরম বৈষম্য। ভারতীয় সৈন্যদের জন্য বরাদ্দ রেশনে থাকত না নিরামিষ খাবার। ফলে ধর্মীয় কারণে অসন্তোষ ছিলই। কাঁকরে ভর্তি চালে মিশে থাকত মাটির ঢেলা। অথচ, সাদা চামড়ার সেনাদের জন্য বরাদ্দ থাকত বাহারি সব খাবার। তাঁরা ভারতীয় স্টাফদের মেস ও ক্যান্টিনে যেতে পারতেন অবাধে। কিন্তু উলটোটার অধিকার ছিল না ভারতীয়দের।
নৌসেনারা কুঠারাঘাত করেন এই মনোভাবের গোড়াতেই। শ্বেতাঙ্গদের মতোই সর্বোচ্চ মানের খাদ্য চান তাঁরা। জানানো হয়, আজাদ হিন্দের সৈনিকদের মুক্তির দাবি। জাতিগত বৈষম্য দূর করা, মিশর ও ইন্দোনেশিয়া থেকে ভারতীয় সেনাদের প্রত্যাহারের দাবিও ছিল তালিকায়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষে সেই সময় ব্রিটেনের রাজনীতিও তোলপাড়। এই অবস্থায় নৌ সেনার বিদ্রোহ আন্তর্জাতিক মহলেও লালমুখোদের মুখ পুড়িয়েছিল।

পরিণতি, ব্রিটিশ সাম্রাজ্যে অস্তমিত হয়েছিল সূর্য । নিছক নৌবিদ্রোহের তকমা ফেলে এই লড়াইয়ের গুরুত্ব কমানোর চেষ্টা তাই ভুল নয়, অপরাধ। উৎপল দত্তর ‘কল্লোল’ নাটকে ফুটিয়ে তোলা হয়েছিল সেই প্রভাবকে। কিন্তু তা কংগ্রেস সরকারের আমলে নিষিদ্ধ হয়। ভাবা যায়! যন্ত্রণার হল, স্বাধীনতার ৭৯ বছর পরেও রক্তাক্ত সেই ইতিহাস উপেক্ষিত। বিস্মৃতির অতলেই যেন তলিয়ে গিয়েছেন বীর সেনানীরা। কে জানে, এটাই হয়তো প্রাপ্য ছিল প্রাণ হাতে নিয়ে ব্রিটিশরাজের বিরুদ্ধে চোখে চোখ রেখে লড়ে যাওয়াদের!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *