চার অঙ্গ হারিয়েও থামেনি স্বপ্ন, ব্যাংককে জোড়া সোনা জিতে ইতিহাস গড়ল পায়েল নাগ
নিজস্ব সংবাদ দাতা : জীবন তাকে অনেক কিছু কেড়ে নিয়েছিল। ছোটবেলাতেই হারাতে হয়েছিল দুই হাত, দুই পা। কিন্তু হার মানেনি মন, থামেনি লড়াই। সেই অসম্ভবকে সম্ভব করেই এবার আন্তর্জাতিক মঞ্চে ইতিহাস গড়ল ওড়িশার ১৮ বছরের তরুণী পায়েল নাগ। ব্যাংককে অনুষ্ঠিত ২০২৬ ওয়ার্ল্ড আর্চারি প্যারা সিরিজে জোড়া সোনা জিতে গোটা দেশকে গর্বিত করল সে। এই সাফল্যের সবচেয়ে বড় চমক আসে ব্যক্তিগত ইভেন্টে। ফাইনালে পায়েল হারিয়ে দেয় বিশ্বের এক নম্বর প্যারা তিরন্দাজ ও প্যারালিম্পিক পদকজয়ী Sheetal Devi-কে। ১৩৯-১৩৬ পয়েন্টে সেই জয় শুধু একটি ম্যাচ জেতা নয়, বরং ছিল নিজের সীমাবদ্ধতাকে অতিক্রম করে উঠে আসার এক অনন্য বার্তা।
শুধু ব্যক্তিগত বিভাগেই নয়, দলগত ইভেন্টেও সোনার ছাপ রেখে দেয় পায়েল। শীতল দেবীর সঙ্গেই জুটি বেঁধে মহিলাদের কম্পাউন্ড টিম ইভেন্টে কাজাখস্তানকে হারিয়ে আরও একটি সোনা জিতে নেয় ভারতীয় জুটি। এক মঞ্চে প্রতিদ্বন্দ্বী, আরেক মঞ্চে সঙ্গী, এই গল্প যেন খেলাধুলার সৌন্দর্যকেও নতুন করে মনে করিয়ে দিল। পায়েলের এই সাফল্য আরও বেশি বিস্ময় জাগায় কারণ সে বিশ্বের প্রথম এবং একমাত্র আন্তর্জাতিক তিরন্দাজ, যার চারটি অঙ্গই নেই। মুখ ও কাঁধের অসাধারণ নিয়ন্ত্রণে তির ছুড়ে সে আজ বিশ্বমঞ্চে নিজের নাম লিখে ফেলেছে সোনালি অক্ষরে। এই অর্জন কেবল পদকের হিসেব নয়, এটি সাহস, একাগ্রতা আর অসম্ভবকে জয় করার এক জীবন্ত উদাহরণ।

ওড়িশার বলাঙ্গির জেলার এক দরিদ্র পরিযায়ী শ্রমিক পরিবারের সন্তান পায়েল। ২০১৫ সালে মাত্র আট বছর বয়সে একটি নির্মাণাধীন ভবনের ছাদে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে তার জীবন আমূল বদলে যায়। চিকিৎসার পর বাঁচলেও হারাতে হয় চারটি অঙ্গই। তারপর এক সময় পরিবার থেকেও বিচ্ছিন্ন হয়ে অনাথ আশ্রমে ঠাঁই হয় তার। সেখান থেকেই শুরু হয় নতুন জীবনের লড়াই।
ভাগ্য যেন সেখানেই তার জন্য আরেকটা দরজা খুলে দেয়। শীতল দেবীর ছোটবেলার কোচ কুলদীপ বেদওয়ানের হাত ধরে পায়েল প্রবেশ করে তিরন্দাজির জগতে। সেই পথচলাই আজ তাকে পৌঁছে দিয়েছে বিশ্বমঞ্চের সেরাদের কাতারে। যে মেয়ে একসময় জীবনযুদ্ধেই টিকে থাকার লড়াই লড়ছিল, আজ সেই মেয়েই দেশের জন্য জোড়া সোনা জিতে কোটি মানুষের চোখে জল আর মুখে হাসি এনে দিল। পায়েল নাগ শুধু একজন চ্যাম্পিয়ন নয়, সে আজ হাজারো ভেঙে পড়া মানুষের কাছে এক জীবন্ত অনুপ্রেরণার নাম।

